জাতীয় সনদ প্রণয়নে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বদলের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা যে পথে চলে স্বৈরাচার হয়েছিলেন, সেই পথে চললে স্বৈরাচার হবেন, এটা নিশ্চিত। প্রয়োজন ওই পথ বন্ধ করা, অর্থাৎ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পরিবর্তন। তাই নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে জাতীয় সনদ প্রণয়ন করতে হবে।’
শনিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) আয়োজিত ‘রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ সম্পর্কে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তারা।
সুজন সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিনের সভাপতিত্বে ও সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকারের সঞ্চালনায় সংলাপে বক্তৃতা করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, স্থানীয় সরকার কমিশনের সভাপতি ড. তোফায়েল আহমেদ, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনুভা জাবিন, বাংলাদেশ জাসদের ডা. মুশতাক হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, সাবেক সচিব আব্দুল আওয়াল মজুমদার, প্রফেসর গাজী জাহিদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি, সুজনের কেন্দ্রীয় সদস্য একরাম হোসেন প্রমূখ।
সংলাপে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের জন্য সুজনের দেওয়া ২১ দফা প্রস্তাব হালনাগাদ করা হয়েছে। সেখানে দ্বিকক্ষ সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ ‘শাসিত’ সরকার, ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদ সদস্য প্রত্যাহার, মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।
এর আগে রাষ্ট্র সংস্কারে ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করার লক্ষ্যে কাঙ্খিত জাতীয় সনদের একটি খসড়া তৈরি করে জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে অনেকগুলো নাগরিক সংলাপের আয়োজন করা হয়। ওই সকল সংলাপ থেকে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পেশ করা হবে। জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে কারো বিরোধিতা কাজে আসবে না।
সারা দেশের মানুষ উৎসাহ নিয়ে ভোটে নেমে পড়বে। এতে এক ধরনের ভারসাম্য আসবে। কারণ তৃণমূলে জনপ্রতিনিধি না থাকায় জনগণ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। সরকার চাইলে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে একটি সুন্দর নির্বাচন করতে পারে। এজন্য স্থানীয় সরকারের একটি একীভূত আইন দরকার।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হলেও সিভিল সোসাইটিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। শুধু রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য দেওয়ায়, তা মতানৈক্য কমিশনে পরিণত হয়েছে। অথচ সব কিছুর ঠিকাদারি রাজনৈতিক দলগুলোকে দেওয়া হয়নি।
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার বাতিল করা সঠিক হয়নি। যারা পালিয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখা যেত। এখন প্রশাসক দিয়ে চলছে। কতদিন চলবে তার ঠিক নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে করতে হবে। কারণ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকলে অন্তত কিছু এলাকা সামাল দেওয়া যাবে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেছেন, বিএনপিকে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার-বিরোধী বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ সর্বপ্রথম আমরাই সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি। সে অনুযায়ী চলমান সংস্কার কাজে আমরা সহযোগিতা করেছি।
তিনি বলেন, আমরা চাই নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসুক। তবে রাতারাতি সবকিছু সমাধান করা যাবে না। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকেও আন্তরিক হওয়া জরুরি। বিচার বিভাগ ও দুদককে সংস্কার করতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন করতে হবে। চীন বা ভারত নয়, সকলকে বাংলাদেশপন্থী হতে হবে।
বিচার ও সংস্কারের পাশাপাশি আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান সাইফুল হক। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত আকাঙ্খা ধারণ করতে পারেনি। ফলে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক দল ও জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থনে গঠিত সরকার বিস্ময়করভাবে নিজেদের দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলছে। এ কারণে সাধারণ মানুষ আবারো হতাশায় নিমজ্জিত হতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্রে তৈরি করা হয়েছে। তাই গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার না করতে পারলে গণ-অভ্যুত্থানের কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাবে না। সংস্কারের বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি বহাল রেখে কমিশনের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘মেরুদণ্ডহীন ও সবচেয়ে দুর্বল’ আখ্যায়িত করে নুরুল হক নুর বলেন, স্বাধীনতার পর কোনো সরকার এতো বড় সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলো এ সরকারকে সহযোগিতা করছে। সিভিল সোসাইটিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও সমর্থন রয়েছে। তবুও সরকার নিজে কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। প্রতিটি বিষয়েই বিএনপির দিকেই তাকিয়ে থাকে। বিএনপির বিরোধিতার মুখে সরকার সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব থেকে পিছিয়ে গেছে। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ দাবির ক্ষেত্রেও বিএনপির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকারকে মেরুদণ্ড সোজা করে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যমান সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনগণ শেখ হাসিনার সরকারকে ফেলে দিয়েছে উল্লেখ করে ডা. তাসনুভা জাবিন বলেন, এনসিপি নির্বাচনকে ভয় পাই না। তবে নির্বাচন ব্যবস্থায় গলদ আগে পরিবর্তন করতে চায়। এজন্য মৌলিক সংস্কার হতে হবে। সংস্কার রাতারাতি হবে না, এটা ঠিক নয়। কারণ ইতোমধ্যে স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। এতো বছরেও সবকিছু একই ধারায় চলে আসছে। নিজেদের অনৈতিক স্বার্থে শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার চায় না, কতিপয় দল। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা উপেক্ষিত। তাদের মানুষ হিসেবে না দেখে নিছক নারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। বড় কোনো সিদ্ধান্তে নারীদের রাখা হচ্ছে না। সংরক্ষিত আসন নারীদের জন্য লজ্জার উল্লেখ করে নারীদের সরাসরি নির্বাচিত হওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, বৈপ্লবিক পরিবর্তন না আসলেও যেগুলোতে ঐকমত্য এসেছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলেও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সত্যিকার অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। চলতি মাসেই জাতীয় সনদ প্রণয়নের কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

