মানুষ বিশ্বসৃষ্টির শ্রেষ্ঠ প্রাণী। সে নীতিবোধ দ্বারা চালিত, যা তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করেছে। সে অপেক্ষাকৃত ভালো দেশ, ভালো সমাজ চায়। যেতে চায় উন্নততর বিশ্বে। আর এখানেই নৈতিক অভিবাসনের প্রশ্ন? অভিবাসন সম্পর্কে বলতে যেয়ে বলা হয় ‘Immigration means a path of legal permanent residing and citizenship’. মানুষ কোনো দেশের নাগরিকত্ব পায় জন্মসূত্রে, অনুমোদন সূত্রে এবং বৈবাহিক সূত্রে। নৈতিক অভিবাসন বলতে বসবাস ও নাগরিকত্বকে বোঝায়। এ অভিবাসনের আছে দুটি দিক। একটি দার্শনিক, অন্যটি অর্থনৈতিক।
প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যতই মতভেদ থাক না কেন, পৃথিবী যে প্রাণীদের বসবাসের জন্য একমাত্র উপযুক্ত গ্রহ; এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় না। অসংখ্য জলচর, স্থলচর, উভচর, খেচর প্রাণীদের মধ্যে মানুষ একটি জাতি, যেসব স্থানে বিচরণ করতে পারে। আর মানবজাতির জন্য সৃষ্টির সবকিছুই আবর্তিত। এ পৃথিবীর সাগর-মহাসাগর, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, মরুভূমি প্রভৃতি একটি বিশাল অংশজুড়ে আছে। আর মানুষের বসবাস আয়তনের তুলনায় খুবই সামান্য অংশ নিয়ে। ভৌগোলিক ব্যবধানের কারণে পৃথিবীতে বিভিন্ন বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি চিন্তার মানুষ দেখা যায়। অর্থনৈতিক সামঞ্জস্যহীনতার কারণে উন্নত, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের অস্তিত্ব পরিচালিত হয়। অর্থনৈতিক চরম সামঞ্জস্যহীনতার কারণে আধুনিক বিশ্ব বিবেক মানবতাবাদ নামে একটি নৈতিক মতাদর্শ দ্বারা চালিত হয়; কিন্তু মানবতাবাদ মানুষের জীবনযাত্রাকে সামঞ্জস্য দান করতে পারেনি। কারণ এক দেশ অপর এক দেশকে, এক জাতি আর এক জাতিকে দাবিয়ে রাখার মানসিকতা প্রাচীনকালের মতো এখনো যায়নি।
মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, জগতে কিন্তু তার ভেতর প্রবৃত্তিকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পৃথিবীতে যারা উন্নত রাষ্ট্র, তারা নানা দিক দিয়ে ষড়যন্ত্র করে গরিবকে আরও গরিব এবং ধনীকে আরও ধনী করতে খুব ব্যস্ত। তারা বিশ্ববাজার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার নানা কলাকৌশল অবলম্বন করেন। তার মধ্যে মুক্তবাজার অর্থনীতি একটি বিশেষ দিক, যা উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে। উন্নত দেশগুলো তাদের বিশ্ববাজার সৃষ্টি করার জন্য তৎপর। তাদের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিক থাকায় এবং উৎপাদন খরচও কম হয়। আর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর তুলনামূলকভাবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে দ্রব্যসামগ্রী ছাড়ার সময় উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছাড়তে হয়; যার কারণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দ্রব্যমূল্য বেশি খরচ পড়ে যায়। মানুষ সর্বাপেক্ষা কম দামে বেশি উপযোগ পেতে পছন্দ করে। তাই উপযোগ পাওয়াকে কেন্দ্র করে উন্নতশীল দেশগুলোর দ্রব্যকে কিনতে পছন্দ করে। আর গুণগত মান বিচারে তাদের দ্রব্য উন্নত হওয়া স্বাভাবিক। এ কারণে বাজার যখন উন্মুক্ত করা হয়, তখন উন্নত বিশ্বের দ্রব্যের একচেটিয়া প্রভুত্ব থাকে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিল্প-কলকারখানার রগ্ণতা এ মুক্তবাজার অর্থনীতির ফল। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের যখন বলা হয়, ভিসামুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য, তখন তারা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল দিয়ে ঘিরে ফেলে এবং তার অবাধ পণ্য চলাচলে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি বিরোধী ভিসামুক্ত বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে। তাদের মুখে মানবতার সুর শোনা যায়। অথচ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে তারাই শীর্ষে। পশ্চিমা দুনিয়ার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বের সম্পদ ভান্ডারকে। তাদের যখন ভোগের পেয়ালা উপচে পড়েছে, তখন উন্নয়নশীল দেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ লোক বিশুদ্ধ খাবার পানি থেকেও বঞ্চিত। তারা যখন অত্যাধুনিক রকমারি অনেক সজ্জায় উল্লাসের নৃত্যে মত্ত, তখন উন্নয়নশীল দেশের অর্ধেকের বেশি লোক বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে। আর মৌলিক অধিকার যে বিপর্যস্ত, তা বাস্তবে দুনিয়ার দিকে নজর দিলে সহজেই অনুধাবন করা যায়। বস্তুতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা, জাগতিক বিদ্বেষ এবং বিভিন্ন মতাদর্শ ও রাজনীতি বিশ্বের বুকে শান্তিকে চিরতরে বিদায় করেছে।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ ধনী দেশগুলোর জনসংখ্যা হলে, ৮৬ শতাংশ সম্পদ ভোগ করছে তারা। তাই জনসংখ্যায় ৮০ শতাংশই মানবাধিকারের মৌলিক উপাদান থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। বেকার জনসংখ্যায় বিশ্ব ভরে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কেউ যদি বলে ভিসামুক্ত বিশ্ব চাই, উন্নত বিশ্বের অভিবাসন চাই, তাহলে তাকে আমরা অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেব কিনা, তা ভাবার অপেক্ষা রাখে। মানুষের ভেতর যদি সামান্য মমতাবোধ থাকে, যদি নিছক পশু এবং ইন্দ্রিয় সুখ দ্বারা সে তাড়িত না হয়ে বঞ্চিত মানুষের দিকে দৃষ্টিপাত করে এবং তার ভেতর যদি নৈতিক এবং আত্মিক কোনো শিক্ষা থাকে, তাহলে মানুষের স্বার্থে সেই উপকারে এগিয়ে আসবে। পৃথিবীর সব সম্পদ এভাবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে ভোগ করতে না দেওয়ার পক্ষে আন্দোলন জোরদার করতে হবে। নীতিবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক বিশ্বসমাজকে এক রাষ্ট্র হিসাবে দেখেন। যেখানে থাকবে না কোনো এলাকাভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদ। মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না, থাকবে নৈতিকতার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা। আর এ মানবাধিকার বিশ্ববাসীকে অর্জন করার জন্য চাই সব ধরনের সংকীর্ণতা পরিহার করে মানবতায় মহান ভূমির ওপর মানুষের নিবাস গড়ে তোলা এবং মানসিক এবং নন্দনতত্ত্বের চর্চা করে উগ্রবস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা। তবেই সমাজে সামঞ্জস্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। আর এর মাধ্যমে গঠিত হবে হবে নৈতিক অভিবাসনমূলক সমাজ ও বিশ্ব।
মানবসম্পদ মানব পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়ে অর্থনৈতিক শক্তি কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে। দেশের জনসংখ্যা সমস্যাকে জনসম্পদে পরিণত করে দক্ষ শ্রমশক্তি রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করতে পারে। তবেই দেশ হয়ে উঠবে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল। তবে বৈধ অভিবাসনই পারে আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নৈতিক এবং আত্মিক উন্নয়ন করতে; যা একটি জাতির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আইন। আমরা ভাষা আন্দোলনে জিতেছি, স্বাধীনতা সংগ্রামে জিতেছি। সুতরাং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ থাকব না আর। এক্ষেত্রে নৈতিক অভিবাসনই পারে আমাদের আত্মিক ও আর্থিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে।
-শহিদুল ইসলাম

